Places to visit

All Places

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের বাস-ঘর

একসময়ে কামারপুকুরের প্রাঙ্গনের পশ্চিম দিকের দক্ষিণ মুখী ঘরে ঠাকুর বাস করতেন, বর্তমানে সেটি মন্দির প্রাঙ্গনের একটি অংশ। একদা ঠাকুর মা সারদা কে বলেছিলেন “আমার মৃত্যুর পরে, তুমি কামারপুকুরে থাকবে, সবুজ শাক সব্জী চাষ করবে, সহজ ভাবে জীবন যাপন করবে এবং ঈশ্বরের নাম নিয়ে তোমার দিন কাটাবে।

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মন্দির

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আর্বিভাব এবং তাঁর শিষ্য ও ভক্তদের এই পুণ্য স্থানে যাতায়াতের জন্য এই স্থানটি তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে। সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ভক্ত বৃন্দ আসেন এই স্থান পরিদর্শনের জন্য এবং নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটান।

রঘুবীরের মন্দির

কামারপুকুরের রঘুবীরের ঘরটি ছিল পূর্বমুখী। খড়ের ছাউনি আঁটা ঘরটির মেঝে এবং দেওয়াল ছিল মাটির। বর্তমানে রঘুবীরের মন্দিরটি ঐ একই স্থানে, একই পরিমাণ যায়গা নিয়ে তৈরী হয়েছে। এই মন্দিরের রঘুবীরের শালগ্রাম শিলা, মা শীতলার মাটির ঘট, রামেশ্বর শিবলিঙ্গ, নারায়ণ শালগ্রাম শিলা এবং একটি গোপালের চিত্র প্রতিদিন পূজিত হয়।

যোগী এর শিব মন্দির

ঠাকুরের ঘরের উত্তর দিকে যোগীর শিব মন্দির। একবার এই মন্দিরের সামনে ঠাকুরের মা ধাত্রী মা ধনী ঠাকুরানীর সাথে কথা বলছিলেন, এমন সময় হঠাৎ শিবের মূর্তি থেকে একটি আলো আর্বিভূত হয় সেই আলোকে গোটা মন্দিরটি আলোকিত হয়ে ওঠে এবং আলোটি দ্রুত তাঁর শরীরে প্রবেশ করে। আশ্চর্যে, ভয়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন, যখন তাঁর জ্ঞান আসে তখন তিনি অনুভব করেন সেই আলোটি তাঁর গর্ভে তখনও রয়েছে এবং তিনি গর্ভ ধারণ করেছেন। ফলস্বরূপ গদাধরের জণ্ম।

হালদার পুকুর

শিব মন্দিরের উল্টো দিকে বৃহৎ জলাশয়টির নাম হালদার পুকুর। এই পুকুরে গদাধরের ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছ। গদাধর ছেলেবেলায় তাঁর বন্ধুদের নিয়ে এই পুকুরে সাঁতার কাটতে আসতেন।

গোপেশ্বর শিবের মন্দির

রামকৃষ্ণের ঘরের পূর্ব দিকে গোপেশ্বর শিবের মন্দির। সুখলাল গোস্বামী অথবা তাঁর ঠাকুরদা গোপীলাল গোস্বামী এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং এতে একটি বিরাট শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছিলেন। একবার রামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরে ভাবের ঘোরে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন, তাঁর মা খবর পেলেন গদাধর পাগল হয়ে গেছেন, তিনি এই গোপেশ্বরের মন্দিরে ঈশ্বরের কাছে কঠিন ব্রত করেন ছেলেকে সুস্থ করে দেওয়ার জন্য।তখন তিনি একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পান যে তাকে একই ভাবে মুকুন্দপুরের শিবের কাছে প্রার্থনা করার নির্দেশ দিচ্ছে, তাঁর এই কঠিন ব্রতর পর তিনি আশ্বাসিত হয়েছিলেন তাঁর পুত্র সুস্থ হয়ে উঠবে।

লাহাদের বিদ্যালয়

লাহাদের দূর্গা মন্দিরের সামনে যে বিশাল নাটমন্দির সেখানেই স্কুল হত। গদাধর পাঁচ বছর বয়সে সেখানে ভর্তি হয়। সে খুব তাড়াতাড়ি লিখতে এবং পড়তে শিখে গিয়েছিল কিন্তু লেখাপড়ায় তার আগ্রহ কমে গিয়েছিল, অন্য এক ভাবের বিকাশ ঘটছিল তার মধ্যে। কোন সময়ে বিশেষ দৃশ্য দেখে অথবা বিশেষ দেবতার চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ত। তার এই অবস্থাকে তার মা অসুখ হয়েছে বলে ভাবতেন এবং তাকে অনেকদিন পর্যন্ত স্কুলে পাঠাতেন না।

ঠাকুরের লাগানো আমগাছ

বৈঠকখানাটি ছিল মানুষজনের সাথে আলোচনা করার যায়গা। বৈঠকখানায় পুরানো কাঠের দরজাটি আজও যথাস্থানে আছে। বৈঠকখানার পূর্বে রয়েছে ঠাকুরের হাতে লাগানো আম গাছ, যা আজও ফলদায়ী।

মাতৃমন্দির মঠ

সারদা দেবীর বাসভবনটি বর্তমানে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধীনস্থ। বাসভবনটি একটি মঠে রূপান্তরিত করা হয়েছে। মঠটির নাম “মাতৃমন্দির মঠ, জয়রামবাটী”। এই মঠের মধ্যে আছে মাতৃমন্দির, মায়ের পুরাতন বাটী ও নূতন বাটী, পুন্যিপুকুর ও সুন্দরনারায়ণ ধর্মঠাকুরের মন্দির।

ধনী কামারানীর মন্দির

রামকৃষ্ণের ঘরের দক্ষিণ পূর্ব দিকে ধনী কামারানীর ঘর। সেই জায়গাতে এখন তাঁর ভক্তরা মন্দির বানিয়েছেন। সেখানে ধনীর কোলে গদাধর এইরূপ তৈলচিত্র করা আছে। ধনী ছিল কামার ঘরের মেয়ে, গদাধরের ধাত্রী মাতা। একবার ধনীকে গদাধর কথা দিয়েছিলেন যে গদাধরের উপনয়নের সময় গদাধর যেন ধনীর কাছ থেকে প্রথম ভিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু অব্রাহ্মণেকে ভিক্ষা দান চট্টোপাধ্যায় পরিবারের প্রথা বিরুদ্ধ ছিল। 

মুকুন্দপুর শিব মন্দির

ঠাকুরের জণ্মস্থানের দক্ষিণ পশ্চিম দিকে এই মন্দিরটির অধিষ্ঠান। গোপেশ্বরের মন্দিরের আদেশ পেয়ে গদাধরের মা এই মন্দিরে অন্ন, জল ত্যাগ করে শিবের কাছে প্রার্থনা করেন তার ছেলেকে পাগলামির হাত থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। তখন তিনি এই দৈব বাণী শুনতে পান – “ তুমি ভয় পেও না তোমার ছেলে পাগল নয়, সে ঈশ্বরের নেশায় উন্মত্ত তাই সে এরূপ করছে। সেই থেকে অনেক মানুষ সেই মন্দিরে যান তাদের মনস্কামনা পূর্ন করতে এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন।

মায়ের নতুন বাড়ী

“মায়ের নূতন বাটী” মাতৃমন্দির মঠে অবস্থিত সারদা দেবীর নতুন বাড়ি। মঠের প্রধান প্রবেশদ্বারের পাশে একটি ছোটো দরজা দিয়ে নতুন বাড়িতে প্রবেশ করা যায়। এই অংশে অনেকগুলি ঘর দেখা যায়। এর মধ্যে বাঁদিকের প্রথম ঘরটিতে সারদা দেবী ১৯১৫ সালের মে মাস থেকে ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বাস করেন। এই ঘরেও তাঁর অনেক গৃহী, ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসী ভক্ত তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা পেয়েছিলেন। পাশের ঘরটিতে সারদা দেবীর ভ্রাতুষ্পুত্রী নলিনী দেবী বাস করতেন। নলিনী দেবীর ঘরের উল্টোদিকের ঘরটিতে সারদা দেবীর জীবদ্দশায় জগদ্ধাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হত।

মায়ের পুরাতন বাটী

“মায়ের পুরাতন বাটী” মাতৃমন্দির মঠের প্রধান প্রবেশদ্বারের বাঁদিকে অবস্থিত। এটি সারদা দেবীর পুরনো বাড়ি। ১৯১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫২ বছর সারদা দেবী এই বাড়িতে বাস করেছিলেন। এখানে তাঁর অনেক গৃহী, ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসী ভক্ত তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা পেয়েছিলেন।

সুন্দরনারায়ণ ধর্মঠাকুরের মন্দির

পুন্যিপুকুরের পাশে একটি ছোটো ঘরে সারদা দেবীর গৃহদেবতা সুন্দরনারায়ণ ধর্মঠাকুর পূজিত হন। আগে এখানে শীতলা ও শালগ্রাম শিলাও পূজা করা হত। পরবর্তীকালে এই মন্দিরে আরও কিছু দেবদেবীর মূর্তি ও ছবি স্থাপন করা হয়।

সিংহবাহিনী মন্দির

জয়রামবাটী মাতৃমন্দির মঠের কাছে সিংহবাহিনী দেবীর মন্দির অবস্থিত। সিংহবাহিনী জয়রামবাটীর গ্রাম্য দেবী। ইনি দুর্গার একটি রূপ। এই মন্দিরে কোনো দেবীর পূর্ণাঙ্গ মূর্তি নেই। শুধু সিংহবাহিনী দুর্গা, মহামায়া, চণ্ডী ও মনসার ধাতব মুখ পূজা হয়। সারদা দেবী বহুবার এই মন্দিরে পূজা দিয়েছিলেন। এই মন্দিরের মাটি স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাসে পবিত্র এবং ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত।

রাস মন্দির

লাহারা এক সময়ে কামারপুকুর অঞ্চলে খুবই বর্ধিষ্ণু ও সম্পন্ন পরিবার ছিলেন। তাদের একটি রাসমঞ্চ ছিল এবং এখানে রাসপর্ব দেখতে বহুদূর থেকে মানুষ আসত। বহু মাটির মূর্তি দিয়ে মন্দিরের চারপাশ সাজান হত। যাত্রা, পালা, কীর্তন ও আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে লাহাদের অবস্থার অবনতি হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রাসমঞ্চটি ধবংস হয়। বর্তমানে এখানে একটি নতুন রাসমঞ্চ নির্মান করা হয়েছে এবং প্রতি বছর রাস উপলক্ষ্যে রাধাকৃষ্ণ মূর্তি স্থাপন, মেলা ও উত্সবের আয়োজন করা হয়।

লাহাদের বিষ্ণু মন্দির

পাঠশালার অনতিদূরে লাহাবাবুদের এই বিষ্ণুমন্দিরটি অবস্থিত। এটি দেখতে দালানের মত। মন্দিরটির সামনের দেয়ালের উপরে এবং দুই পাশে মোট ২০টি পোড়ামাটির মূর্তি রয়েছে। গর্ভগৃহে সিংহাসনে দামোদর শিলা। বালক গদাধরের যখন পাঠশালায় পড়াশোনা করতে ভাল লাগত না, তখন তিনি এখানে এসে মা কালীর মূর্তি আঁকতেন ও ধ্যান করতেন। লাহা বংশীয় জগন্নাথ লাহা অষ্টাদশ শতকে মারাঠা বর্গীদের আমলে মন্দিরটি নির্মান করেছিলেন। মন্দিরে তিনটি কুঠুরীগৃহ আছে। মন্দিরের সামনে একটি বোর্ডে লেখা আছে ” এই মন্দিরটির উপরে ও নীচে বাড়ি আছে।”

লাহাদের দুর্গা মন্দির

পাঠশালার পশ্চিমদিকে ঠিক মুখোমুখি লাহাবাবুদের চণ্ডীমণ্ডপ বা দুর্গামন্দিরটি অবস্থিত। ১২৫৭ বঙ্গাব্দে তত্কালীন জমিদার ধর্মদাস লাহা এটি নির্মাণ করেন।প্রতি বছর এখানে ঠিক আগের মতই পূজা হয়ে থাকে।

লক্ষ্মীজলা ও ভূতির খাল

ক্ষুদিরামকে সুখলাল গোস্বামী কয়েকটি কুঁড়ে ঘর এবং এক বিঘা দশ ছটাক জমি চিরদিনের জন্য দান করেন। এই জমিই লক্ষীজলা। এখানে এত ধান জন্মাত যে পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিথি সৎকার করেও অনেক উদ্বৃত্ত হত। লক্ষীজলার অনতিদূরেই ভুতির খাল। শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁর কৈশোরের অনেক সময়েই একা বা সমবয়সীদের সঙ্গে এখানে বেড়াতে আসতেন।

বটগাছ ও ভূতির শ্মশান

লক্ষ্মীজলার কাছে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ। এই বটগাছের নীচে শ্রীরামকৃষ্ণ বালকাবস্থায় দিন রাত্রির অনেক সময়েই ধ্যান করে কাটাতেন।ঐতিহাসিক এই গাছটিকে উজ্জীবিত করে রাখার অনেক চেষ্টা চলছে পাশেই ভূতির শ্মশান। যাই হোক, ঠাকুর একটা অদ্ভুত উপায়ে শ্মশানের শিবা ও উপদেবতাদের খাদ্য নিবেদন করতেন। তিনি হাঁড়িতে খাবার ভরে বটগাছের কাছে খোলা জায়গায় রেখে দিতেন এবং উপদেবতারা দল বেঁধে এসে সেগুলি গ্রহণ করত। মাঝে মাঝে খাবার সমেত হাঁড়ি গুলি শূণ্যে উঠে যেত এবং তিনি উপদেবতাদের দেখতেও পেতেন। 

সীতানাথ পাইনের বাড়ী

ঠাকুরের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ীর কিছুদূরে বেনে পাড়ায় ছিল গ্রামের সম্পন্ন পরিবার সোনা-রূপার ব্যবসাদার সীতানাথ পাইনের বাড়ী।সাত পুত্র ও আট কন্যার পিতা সীতানাথ পাইনের সংসার ছিল প্রকাণ্ড বড়।ধর্মভীরু সীতানাথ পাইনের স্ত্রী ও মাঝে মাঝে কন্যারাও বালক গধাধরের বাড়ীতে যাতায়াত করতেন এবং গদাধরকেও তাদের বাড়ীতে আমন্ত্রণ করতেন। গধাধরের অভিনয়, পাঠ ও সংগীত পরিবেশন তাদের বাড়ীর প্রত্যেকেরই খুব প্রিয় ছিল। সীতানাথ নিজে বালক গদাধরকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং তার সাধু প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক ভাবকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন।

পাইনদের বিষ্ণুমন্দির

সীতানাথ পাইনের বাড়ীর সামনে ইঁটের তৈরী একটি শিবমন্দির ছিল। সেই মন্দিরের বেদী ছাড়া আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অনেকেই এই মন্দিরটিকে শিব মন্দির বলে অভিহিত করেন। শোনা যায় মন্দিরের পূজারী ব্রাহ্মণ মূর্তিটি বরানগরে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছেন।

শ্রীরামকৃষ্ণস্মৃতি নাট্যমঞ্চ

ধার্মিক সীতানাথ পাইন শিবরাত্রি উপলক্ষ্যে বাড়ীর সামনে যাত্রাগানের আয়োজন করতেন। একবার ১৮৪৬ খৃষ্টাব্দের ২৪ শে ফেব্রুয়ারী শিবরাত্রির সময়ে যাত্রার আয়োজন করা হয়। যার শিব সাজবার কথা ছিল সে হাঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়ায় বালক গদাধরকে শিবের ভূমিকায় অভিনয় করতে বলা হয়।জটাজুট সাজে তার ভঙ্গী ও ভাব তন্ময়তা এত মর্মস্পর্শী হয়েছিল যে উপস্থিত দর্শকেরা নিস্তব্ধ ভাবে গভীর আগ্রহে তার অভিনয় দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু মঞ্চে উপস্থিত হয়েই গদাধর শিবের ভাবে বিভোর হয়ে পড়েন এবং তার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু নির্গত হতে থাকে। তিনি বাহ্যজ্ঞানশূণ্য হয়ে পড়ায় সেদিন আর যাত্রা অনুষ্ঠিত হয় নি। 

বুধুই মোড়লের শ্মশান

কামারপুকুর গ্রামের পূর্বপ্রান্তে বুধুই মোড়লের শ্মশান। দশঘরা নিবাসী বুধুই মোড়লের নামে এই নামকরণ।  ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কৈশোরে অনেক সময় ভূতির খালের শ্মশান ও বুধুই মোড়লের শ্মশানে অতিবাহিত করেছেন।এই শ্মশানের অদূরে পুরী যাবার রাস্তার পাশে প্রাচীন পান্থশালাটি ছিল। সেখানে অনেক সাধু সন্ন্যাসী এসে সাময়িক ভাবে বিশ্রাম করতেন। বালক গদাধর প্রায়ই এখানে এসে সাধুদের নানা কাজে সাহায্য করতেন এবং তারাও তাকে খুব স্নেহের চোখে দেখতেন। সেই পান্থশালাটি এখন ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে। এখন শ্মশানের কাছে সাধুদের একটি আস্তানা আছে। 

চিনু শাঁখারীর বাস্তুভিটা

কামারপুকুর গ্রামের গোপাল শাঁখারীর ছেলে চিনু (শ্রীনিবাস বা চিনিবাস) শাঁখারী একজন পরম বৈষ্ণব ভক্ত ছিলেন। তিনি রামকৃষ্ণদেবের চেয়ে প্রায় ১৭ বছরের বড় ছিলেন। বালক গদাধরের দিব্যভাব ও ঐশ্বরিক আবেশ তাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি গদাধরকে দেখে মনে করতেন শ্রীচৈতন্যদেব পুণরায় আবির্ভুত হয়েছেন। গদাধরকে খাওয়াতে তিনি খুবই ভালবাসতেন। পরবর্তী কালে শ্রীরামকৃষ্ণ তাকে ‘চিনে শাঁখারী ‘ বলেও উল্লেখ করেছেন। ঠাকুরের দেহরক্ষার পরেও প্রায় সাত বছর শ্রীনিবাস বেঁচে ছিলেন। দক্ষিণেশ্বরেও ঠাকুরের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। 

মানিকরাজার প্রাসাদের ধবংসাবশেষ

আনুমানিক ১৭৬৪ খৃষ্টাব্দে ভুরসুবো গ্রামে মানিকচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত ভক্তিমান ও ধর্মপরায়ণ ছিলেন এবং দাতা হিসাবেও তার যথেষ্ট সুনাম ছিল। এই কারণেই লোকে তাকে মানিকরাজা বলে ডাকত। তিনি গদাধরের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এই সূত্র ধরেই বালক গদাধর মাঝে মাঝে তার বাড়ীতে যেতেন। মানিকরাজাও তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং কয়েকদিন অনুপস্থিত থাকলেই কাউকে পাঠাতেন গদাধরের খবর নেবার জন্য। 

বিশালক্ষী মা এর মন্দির

কামারপুকুরের প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তরে বিশালাক্ষ্মী (কারও মতে বিষলক্ষ্মী) দেবীর মন্দির অত্যন্ত জাগ্রত বলে পরিচিত। ঠাকুরের সময়ে আশে পাশের গ্রাম থেকে অনেক লোক মনস্কামনা পূরণের জন্য মানত করে পূজা দিতে আসত।ক সময়ে মন্দিরটি খোলা আকাশের নীচে কোন আচ্ছাদন বিহীন অবস্থাতেই ছিল। এ সম্বন্ধে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ রচয়িতা সারদানন্দ স্বামী একবার মন্দির দর্শনে গিয়ে গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে .

গড় মান্দারণ

গড় মান্দারণ একটি ঐতিহাসিক স্থান। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গে আছে “কামারপুকুরের দক্ষিণ-পূর্ব বা অগ্নিকোণে মান্দারণ গ্রাম। চতুষ্পার্শস্থ গ্রাম সকলকে শত্রুর আক্রমণ হইতে রক্ষা করিবার নিমিত্ত পূর্বে কোন কালে একটি দুর্ভেদ্য দূর্গ প্রতিষ্ঠিত ছিল। পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্রকায় আমোদর নদের গতি কৌশলে পরিবর্তিত করিয়া উক্ত গড়ের পরিখায় পরিণত করা হইয়াছিল।” বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বড় বড় স্তূপের ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখা যায়।

পুণ্যপুকুর

মায়ের মন্দিরের সামনেই বৃহৎ পুষ্করিণীটি পুণ্যপুকুর নামে খ্যাত। মা দীর্ঘ দিন এই পুকুরের জল ব্যবহার করেছেন। একবার মা ১৯১৮ সালের এপ্রিল মাসে সম্ভবতঃ শেষ বারের মত জয়রামবাটিতে এলে শরৎ মহারাজ ( স্বামী সারদানন্দ ) পুণ্যপুকুরে জাল ফেলে বড় বড় মাছ ধরে মঠের এবং মায়ের বাড়ীর সবাইকে সেই মাছ পরিবেশন করে তৃপ্তি দান করেন। বর্তমানে মন্দির এবং পুকুর এবং মায়ের পুরান বাড়ী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং মঠ কর্তৃপক্ষ দ্বারা সংরক্ষিত।

গদাধর শিশু উদ্দ্যান

কামারপুকুরের একমাত্র শিশুদের জন্য উদ্যান এটি। কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মিশন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।এটি খোলা থাকে প্রতিদিন বিকাল ৪ টা থেকে ৬ টা অবধি।এই উদ্যানের ভিতরে সুসজ্জিত গাছপালা ও বাচ্চাদের বিনোদনের জন্য গেম জোন আছে।

আমোদর নদ

আমোদর আসলে জয়রামবাটীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ছোটো খাল। মা এই খালটিকে বলতেন ‘আমার গঙ্গা’। আমোদরে মা স্নান করতে আসতেন। এর পাড়ে একটা শ্মশানও আছে। মায়ের ঘাট থেকে কিছুদূরে গেলে একটা আমলকি গাছ দেখা যাবে। এখানে বহু আগে একটি আমলকি গাছ ছিল। তারই স্মৃতিতে বর্তমান আমলকি গাছটি পোঁতা হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘আমলকি গাছের তলায় বসে ধ্যান করলে, সব মনোস্কামনা পূর্ণ হয়।’ যোগিন মা, গোলাপ মা, গৌরী মা প্রমুখ ঠাকুরের সব শিষ্যা এবং স্বামী সারদানন্দ সহ একাধিক সন্ন্যাসী এখানে জপধ্যান করতে আসতেন।

মায়ের ঘাট

বাল্যকালে মা একটি দিঘির পাড়ে ঘাস কাটতে যেতেন গোরুদের খাওয়ানোর জন্য। এই দিঘিটিই এখন মায়ের দিঘি নামে পরিচিত। আর এই দিঘির ঘাটটিকে বলে মায়ের ঘাট। মায়ের ঘাট আজকের জয়রামবাটীর বাসস্টপের নাম।

তেলোভেলোর মাঠ

হুগলি জেলার আরামবাগ শহর ছাড়িয়ে কিছুদূরে গেলে পড়ে তেলোভেলোর মাঠ। এই মাঠেই এক সন্ধ্যায় এক ডাকাত দম্পতির সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন মা। মাতৃসংস্পর্শে কিভাবে সেই দুর্ধর্ষ ডাকাতেরও মন গলেছিল ; সে গল্প আমরা সবাই জানি। ঠিক যে স্থানে মায়ের সঙ্গে তাঁর ডাকাতবাবার সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেই স্থানটিতে এখন মায়ের একটি মন্দির স্থাপন করা হয়েছে।

জগদ্ধাত্রী পূজামণ্ডপ

মাতৃমন্দিরের দক্ষিণে মাটির দেওয়াল ও খড়ের চাল-যুক্ত এই মণ্ডপটিতেই মা জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু করেছিলেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর মা জগদ্ধাত্রী পূজা করেন। প্রতি বছর পূজার সময় তিনি অবশ্যই জয়রামবাটী আসতেন। মায়ের দেহরক্ষার পরও জগদ্ধাত্রী পূজায় ছেদ পড়েনি। আজও মাতৃমন্দিরে মহাসমারোহে জগদ্ধাত্রী পূজা আয়োজিত হয়।

দেরেপুর

দেরেপুর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আদিবাড়ি। মামলায় মিথ্যা বয়ান না দেবার জন্য ঠাকুরের বাবা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়কে দেরেপুর ছাড়া করিয়েছিলেন তখনকার জমিদার।তারপর তাঁরা কামারপুকুর চলে আসেন।

ভানুপিসির বাড়ি

ভানুপিসি ছিলেন মায়ের ছেলেবেলার সঙ্গিনী। তিনিও ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদধন্যা। ঠাকুর তখন দক্ষিণেশ্বরে সাধনা করছেন। গাঁয়ে রটে গেল তিনি পাগল হয়ে গেছেন। অজ্ঞ গ্রামবাসীদের কূটকচালির হাত থেকে রেহাই পেতে মা সেই সময় প্রায়ই ভানুপিসির বাড়ি চলে যেতেন। মা যখন নেহাত শিশু, তখন থেকেই ভানুপিসি তাঁর মধ্যে দৈবী সত্ত্বা দেখতে পেতেন। শোনা যায়, তিনি মায়ের চতুর্ভূজা মূর্তিও দর্শন করেছিলেন।

কোয়ালপাড়া জগদম্বা আশ্রম

জয়রামবাটী থেকে তিন মাইল উত্তরে কোয়ালপাড়া। মায়ের জীবনের সঙ্গে এই আশ্রমের যোগ নিবিড়। রেলপথ হওয়ার পর মা জয়রামবাটী থেকে বিষ্ণুপুর হয়ে কলকাতা আসতেন। বিষ্ণুপুরে আসার পথে কোয়ালপাড়া আশ্রমে বিশ্রাম করতেন। ১৯০৯ সাল থেকে ১৯১৯ সালের পর্যন্ত মা যতবার বিষ্ণুপুর এসেছেন, ততবারই কোয়ালপাড়ায় বিশ্রাম করেছেন। দু-বার দীর্ঘসময়ের জন্য মা এখানে বাসও করেছিলেন। কোয়ালপাড়াকে মা বলতেন, আমার বৈঠকখানা।

শিহড় (ঠাকুরের ভাগ্নার বাড়ি)

ঠাকুরের ভাগ্না হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি শিহড় গ্রামে।এটি জয়রামবাটী থেকে ২ কিমি দুরে অবস্থিত।একবার হৃদয় ঠাকুরকে দুর্গাপূজা করতে বলেন।ঠাকুর তখন কলকাতায় থাকেন।সশরীরে উপস্থিত না থেকেও তিনি সন্ধিপূজার সময় হৃদয়কে দেখা দেন।

গৃহদেবতার মন্দির

পুণ্যপুকুরের পশ্চিম পাড়ে একটি ছোটো বাড়ি রয়েছে। এটি আসলে মায়ের গৃহদেবতা সুন্দরনারায়ণ ধর্মঠাকুরের মন্দির। মায়ের পিতৃদেব রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের উর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষ খেলারাম মুখোপাধ্যায় বিষ্ণুপুরের রাজার থেকে ধর্মঠাকুরের সেবক হিসেবে দেবোত্তর জমি পেয়েছিলেন। মন্দিরের ভিতর সামনের দিকে কচ্ছপের আকৃতিবিশিষ্ট সুন্দরনারায়ণ ধর্মশিলার অধিষ্ঠান। এখানে ষষ্ঠী ও শীতলা দেবী এবং নারায়ণ শিলাও পূজিত হয়। 

শান্তিনাথ মন্দির

শান্তিনাথ মন্দির। এই মন্দিরের নাটমণ্ডপে জগজ্জননী স্বয়ম্ ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণকে পতি রূপে নির্বাচন করেছিলেন।

নরনারায়ন মন্দির

জয়রামবাটীতে অবস্থিত এই মন্দিরটিতে ৪-৫ বছরের বাচ্চাকে নারায়নরুপে পুজো করা হয়।এই মন্দিরটি রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশন ব্যারাকপুরের অন্তর্গত।এখানেও দুপুরে প্রসাদের ব্যাবস্থা থাকে প্রতিদিন।